স্টাফ রিপোর্টার
ঈদ এলেই ব্যস্ততা বেড়ে যেতো কামার পাড়ায়। দিন-রাত লোহা পেটানোর শব্দ। ঘুমে ব্যঘাত হত প্রতিবেশীদের। দিন পাল্টেছে। এখন আর ব্যস্ততা নেই কামার পাড়ায়। অনেকেই পেশা ছেড়েছেন। কিন্তু শচীন কর্মকার, সুদেব কর্মকার ও সুকুমার কর্মকার সহোদর পেশা ছাড়েনি। তবে তারা আর আগামী প্রজন্মকে লোহা পেটানোর ব্যবসায় আনতে চান না।
সূত্র মতে কুষ্টিয়ার খোকসার ইউনিয়ন গুলোর মধ্যে মানিকাট, কমলাপুর, আজইল, ভবানীগঞ্জ, উথলি, মামুদানীপুরসহ ১০টি গ্রামে প্রায় ৭ শত পরিবার কৃষি ও ঘর গৃহস্থলীর কাজে দা, কাঁচি, কুড়াল, বটিসহ নানা পদের জিনিষপত্র তৈরী করে দুধে মাছে চলতো। কিন্তু লোহা পিটে যন্ত্র বানোর মত কঠিন কাজ এখন আর কেউ করতে চায় না। এ ছাড়া স্পাত লোহা কয়লা সংকট রয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও ঈদ উৎসব এলে পাইকাররা গ্রামে গ্রামে এসে দিনের পর দিন মালের জন্য অপেক্ষা করতেন।
জয়ন্তী হাজরা ইউনিয়নের মামুদানীপুর কামার সম্প্রদায়ের ১৪ থেকে ১৫টি পরিবারের সববাস ছিল। এই গ্রামের লোহার কর্মকারদের তৈরী দা, কাঁচি, কুড়াল, বটি, খুন্তা (মাটিতে গর্ত করার যন্ত্র) এলাকার চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হতো। স্পাত লোহা, কয়লা ও শ্রমিকের সংকটে অনেকেই লোহার কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় পাড়ি জমিয়েছে।
তবে পেশা বদলাতে পারে মামুদানিপুর গ্রামের মৃত তারাপদ কর্মকারের তিন ছেলে শচীন কর্মকার, সুদেব কর্মকার ও সুকুমার কর্মকার। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও চার পুরুষের ব্যবসা ধরে রেখেছেন। ঘর গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহারের দা, বটি কাচি তৈরী ও মেরামতের কাজ করে তাদের তিন ভাইয়ের ১২ জনের পৃথক পরিবার চলছে। ছেলে সন্তানদের লেখা পড়া করাচ্ছেন। তবে আগামী প্রজন্মকে আর এই পেশায় আনতে চান না।
পাইকপাড়া ফুলতলা থেকে ফুলবাড়ি বাজারে যেতেই মামুদানীপুর। পাকা রাস্তার পাশে বিশাল বটগাছের নিচে সাড়ে সাড়ে কয়েকটা জীর্ণশীর্ন ঘর দাঁড়িয়ে আছে। শনখড়ে দিয়ে পুরু করে ছাউনি দেওয়া একটি ঘরে কর্মব্যস্ত কয়েকজন মানুষ। লোহা পেটার টুংটাং শব্দের সাথে হাফরের (বাতাস দেওয়ার যন্ত্র) বাতাসের ফুস ফাঁস শব্দ রাস্তা থেকেই পাওয়া যাচ্ছিলো। একমনে কাজ করেছেন তিনজন। পাশে চড়াটের উপর বসে গল্প করছিল কাজ দিতে আসা অপেক্ষায় থাকা কৃষকেরা।
পৈত্রিক ব্যবসার প্রধান কারিগর শচীন কর্মকার। খুবই কম কথা বলেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন সবার ছোট সুকুমার কর্মকার। সামান্য কিছু জমির ফসল আর ব্যবসার আয় দিয়ে তারে তিন ভাইয়ের তিনটি সংসার চলে। আগে ঈদের এক মাস আগে থেকে কাজের চাপ বৃদ্ধি পেত। এখন আর তেমন ব্যস্ততা নেই। সারা বছর ঘর গৃস্থালি ও কৃষকের দা কাঁচি তৈরী ও মেরামত করে থাকেন।
তাদের পাশেই জীর্ণদশাগ্রস্থ ঘরে কাজ করছিলেন পাশের গ্রাম ফুলবাড়ির ভম্বল কর্মকারের ছেলে বিপ্লব কর্মকার। মাঠে ৬শতক জমি তার পূজি। থাকেন পরের জমিতে ঘর করে। এই ব্যবসা করেই জীবীকা চলে।
আরও পড়ুন – খোকসায় মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপিত
সুদেব কর্মকার ঘরের এক কোনে বসে কাঁচিতে ধার তুলছিলেন। তিনি জানান, আগে ঈদ পূজা এলেই কর্মব্যস্ততায় তাদের চোখের ঘুম বন্ধ হয়ে যেতো। এখন আর তেমন কাজ হয় না। কারখানায় তৈরী রেডিমেট দা কাচি বটির উপর মানুষের ঝোঁক বেশী। লোহার কাজ তাদের পূর্ব পুরুষেরাও করতে। এই গ্রামে ১৪/১৫ ঘর কর্মকার সম্পদায়ের লোক বসবাস করতো। স্পাত লোহা, শ্রমিক ও মূলধন না মেলায় সবাই পেশা ছেড়েছে। তাদের তিন ভাইয়ের বিকল্প পেশা না থাকায় গ্রামে শুধু তারাই এই ব্যবসা করছেন। তবে ছেলেদের আর এই ব্যবসায় আনতে চান না।