কন্যাশিশু দিবসের ভাবনা

11
তুহিন আফসারী, উন্নয়ন কর্মী

তুহিন আফসারী

দিন তিনেক থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের টাইম লাইনে কন্যাশিশুদের ছবির ছড়াছড়ি। বাবারা অথবা মায়েরা অসাধারণ সব লেখার সাথে তাদের কন্যাদের ছবি পোস্ট করছেন।

বাবা মায়ের এ সকল লেখা বেশ আবেগি করে তোলে। কল্পনায় আমিও বাবা সেজে তাদের সাথে পুলকিত হয়ে উঠি। এই পুলক বেশি সময় থাকেনা। প্রতিদিনই কোন না কোন খবর সামনে আসে যা আমার কল্পিত পুলকিত ভাবের কপালে ধাক্কা মারে। ভাইয়ের সামনে থেকে বোনকে তুলে নিয়ে খুন করা হচ্ছে, স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষন, বাবার সামনে মেয়ে, সন্তানের সামনে মাকে ধর্ষন এগুলো এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার। এইসব নিয়ে কথা বলে কোন লাভ আছে বলে মনে হয়না আমার। বরং অপেক্ষা করতে থাকেন, নতুন কোন ইস্যু আসলে এসব আপনি এমনিতেই ভুলে যাবেন। আসুন আজ আপনার কন্যাকে নিয়ে কথা বলি।

আপনার বাড়িতে আপনার আদরের মেয়েটি নিরাপদ তো? আপনার বাড়িতে যারা যাতায়াত করে তাদের আচরণ কি আপনার নজরে থাকে? আপনাকে ভয় দেখাচ্ছি না শুধু কয়েকটি পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দিচ্ছি। গবেষণা বলছে, ২০১৮-১৯ সালে আপনাদের কন্যাশিশুদের ৭৫% পরিবারের নিকটজন, পরিচিত জনের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এই নিকটজন কে বা কারা তা নাই-বা বললাম। প্রতি চার জন কন্যাশিশুদের মধ্যে একজন নিকটজনের দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। কোন কিছু বোঝার আগেই আপনার অগোচরে চোখের জলের তীব্র ঘৃণা নিয়ে বড়ো হচ্ছে আপনারই প্রাণের চেয়ে প্রিয় মেয়েটি।

এই আচরণের কথা ও কাউকে বলতে পারেনা কারন এটা আপনি কখনোই বিশ্বাস করবেন না। একবার কল্পনা করুন তো, আপনি সহ সকল পুরুষের প্রতি ঘৃণা নিয়ে বড়ো হচ্ছে আপনার আদরের কন্যা। আপনিও বাদ পড়েন না ঐ তালিকা থেকে কারণ আপনিও পুরুষ। পরিবারের আলাপ আর না-ই বা করলাম।

এবার আসুন বাইরে আপনার কন্যার কি অবস্থা, দেখে নেয়া যাক। ২০১৯ এর জুলাই মাস। দেশে মোট ১০৭ টি ধর্ষনের ঘটনা ঘটেছে তার ৭২টি কন্যাশিশুদের সাথে। সারা বছরের হিসাবটা তোলা রইলো আপনার জন্য। আমি নিশ্চিত, আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন চাই। দি হাঙ্গার প্রজেক্ট ২০০০ সাল থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর জাতীয় কন্যাশিশু দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। এই সংগঠনটির উদ্যোগে দিবসটির জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে। তবে অবস্থার কী কোন পরিবর্তন হয়েছে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার পোস্ট টা যেমন আছে তেমনি কেন ছেলেশিশু দিবস, পুরুষ দিবস নেই সেই প্রশ্নও আছে। বছরের সকল দিন যখন পুরুষময় তখন একটি দিনও আপনি আপনার মেয়েটির জন্য দিতে চান না। এই ভাবনাটা শুধু আপনারই না, গোটা সমাজ ব্যবস্থা এই চিন্তা ধারণ করে। এই কারনেই এই দেশে মেয়েরাও মানুষ, মা বড়, না বৌ বড়, বালিকা বধু নামক সিনেমা তৈরী হয়। তাই যতই আপনি টাইম লাইন মেয়ের পোষ্টারে ভরে ফেলেন না কেন পরিবর্তন কিন্তু অনেক দূরে। এই পরিবর্তনের কাজ করতে হলে আপনার ভাবনায় চিন্তায় পরিবর্তন আসাটা খুব জরুরি। এই পরিবর্তনটা আপনিই শুরু করতে পারেন। আপনি বাবা হয়েছেন, মা হয়েছেন তাই আপনার কন্যাটির নিরাপদে গড়ে তোলার পরিবেশ আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে। আপনার কন্যাটিকে অযাচিত স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করে তুলুন, অনিরাপদ সম্পর্কের বিষয়ে সচেতন করে তুলুন। নিজেকে আস্থা ও বন্ধুত্বের প্রতিক হিসেবে তুলে ধরুন, যার ফলে ও সব কথা আপনাকে নির্ভয়ে বলতে পারে। আপনার সন্তান নিরাপদ থাকুক, মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। সকল কন্যাশিশুর জন্য ভালোবাসা ও শুভকামনা।

Print Friendly, PDF & Email