মানবপাচার ও প্রতারণার অভিযোগ ৭ বিয়ে করা রবিজুল গ্রেপ্তার

0
41

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

ভালো বেতনে আরামের চাকরির প্রলোভন দিয়ে আর্থিক প্রতারণা ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৭ বিয়ে করা কুষ্টিয়ার সেই রবিজুল ইসলামকে (৪২) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

রবিবার সকালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে মানবপাচার ও আর্থিক প্রতারণার বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইবি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেহেদী হাসান।

রবিজুল ইসলাম কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ইবি থানার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের পাটিকাবাড়ি গ্রামের মিয়াপাড়ার আয়নাল মন্ডলের ছেলে। ৭জন নারীকে বিয়ে করা ও একসাথে ঘর-সংসার করায় রবিজুল ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত মুখ৷
তিনি ১৫ বছর লিবিয়াতে ছিলেন।

পুলিশ জানায়, রবিজুল মানবপাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, রাজবাড়ীসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষকে লিবিয়ায় ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় পাঠিয়ে তাদেরকে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার শিকার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ ও মামলার প্রেক্ষিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

রবিজুলের এমন প্রলোভনে পড়ে লিবিয়ায় যান কুষ্টিয়ার তানজির শেখ (২২)। এরপর লিবিয়ার মানবপাচার চক্রের কাছে তাকে বিক্রি করে দেন রবিজুল। লিবিয়ায় মানবপাচার চক্রের টর্চার সেলে দীর্ঘ নয় মাস বন্দী করে রাখা হয় তাকে। নয় মাস সেখানে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। ঠিক মতো খেতে দেওয়া হতো না। বেঁধে রাখতো, তিনবেলা লোহার রড ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হতো। বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারপিটের ভিডিও পরিবারকে পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হতো। অবশেষে মুক্তিপণ নিয়ে তানজিরকে ছেড়ে দিয়েছে মানবপাচারকারী চক্র। ৯ জুলাই দেশে ফিরেছেন তানজির শেখ।

তানজির কুষ্টিয়া পৌরসভার ২০ নম্বর ওয়ার্ডের জগতী স্টেশন বাজার এলাকার সিরাজ শেখের ছেলে। আড়াই বছর আগে কুষ্টিয়ার রবিজুল দালালের মাধ্যমে ট্যুরিস্ট ভিসায় লিবিয়ায় গিয়েছিলেন তিনি। ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে থেকে দফায় দফায় ৩৪ লাখ টাকা নিয়েছে রবিজুল। সেসব টাকা ফেরত ও রবিজুলের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

রবিজুলের খপ্পরে পড়ে নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী যুবক তানজিরের ওপর চালানো নির্মম নৃশংস নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর তাকে আইনের আওতায় আনতে মাঠে নামে পুলিশ। অবশেষে গ্রেপ্তার হন রবিজুল।

এই চক্র সম্পর্কে তানজির আরও বলেন, লিবিয়ার ওই মাফিয়া চক্রে ১৫-২০ জন সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে ৫-৭ জন লিবিয়ার নাগরিক। প্রধান মাফিয়া লিবিয়ার আলী। উনি ওসামার ভাগ্নে বলে পরিচিত। মাফিয়া চক্রের সাথে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন যুক্ত আছে। তাদের বাসা মাদারীপুর, সিলেট ও শরীয়তপুর। তাদের মধ্যে একজনের নাম পিচ্চি সোহেল, তার বাড়ি মাদারীপুর আর কুষ্টিয়ার রবিজুল।

তানজিরের বাবা সিরাজ শেখ বলেন, ভালো চাকরি ও ভালো বেতনের প্রলোভন দিয়ে আমার ছেলেকে লিবিয়ায় পাঠায় রবিজুল। তার সাথে ১১ লাখ টাকায় চুক্তি ছিল। প্রথমে ৫ লাখ টাকা দিই, এরপর আমার ছেলেকে লিবিয়াই পাঠিয়ে দেয়। এরপর বাকি ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করি। এরপর ইতালি পাঠানোর কথা বলে আমার ছেলেকে মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। ছেলে বন্দি থাকা অবস্থায় রবিজুল আরও ২৫ লাখ টাকা দাবি করে। এর কিছুদিন পর রবিজুল বাড়ি থেকে পালিয়ে আত্মগোপনে যায়। এরপর নলখোলা গ্রামের আলামিন নামে একজন আমাদের সাথে যোগাযোগ করে এবং আমার ছেলেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবে বলে প্রলোভন দেয়। সে ১৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা নেয়। এতে কোনো কাজই হয়নি। এরপরে মাফিয়াদের পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে আমি আমার ছেলেকে ছাড়িয়ে এনেছি। রবিজুল ও আলামিনের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি চাই। একই সাথে আমি আমার টাকা ফেরত পেতে চাই।

আরও পড়ুন – ন্যায্য মুজরী পায়না শিশু শ্রমিকরা

নির্যাতনের শিকার তানজিরের মা চম্পা খাতুন বলেন, রবিজুল দালাল প্রলোভন দিয়ে আমার ছেলেকে বিদেশে পাঠায়। এরপর তাকে মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। মাফিয়ারা মুক্তিপণের দাবিতে আমার ছেলেকে বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করে, মারপিট করেছে। আমার ছেলে মরা মানুষের সাথে শুয়ে ছিল। রবিজুল আমাদের ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে।

আরও পড়ুন – খোকসায় বিয়ের আগের রাতে কনের বাড়িতে ডাকাতি