কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে দোকান বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিষিদ্ধ আ.লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও তার অনুসারী আওয়ামী লীগের নেতারা বিলাসবহুল বহুতল বিশিষ্ট এই বাণিজ্যিক ভবনের শতাধিক দোকান নামে বেনামে বাগিয়ে নিয়েছেন।
এনিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে দুদকের নজরে আসে। এসব অভিযোগে তদন্তে নেমেছে দুদক। বুধবার (৬ আগস্ট) বেলা ১২টা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের থানা পাড়ায় এনএস রোডে জেলা পরিষদের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে দুদক। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের সমন্বিত কুষ্টিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক বিজন কুমার রায়। তিনিই অভিযানের নেতৃত্ব দেন।
অভিযোগ রয়েছে, বাণিজ্যিক ভবনে দোকান বরাদ্দে অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট করা হয়েছে। অনিয়মকে নিয়ম বানিয়ে বরাদ্দের এসব দোকান লুটে নেয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা পরিষদ নির্মিত কুষ্টিয়ার একটি ৯ তলা ভবনের দোকান বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ৪১ কাঠার ওপর নির্মিত ভবনের প্রায় অর্ধেক দোকানই দেওয়া হয়েছে কার্যত নিষিদ্ধ আ.লীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ অনুসারীদের। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই বাণিজ্যিক ভবনটি তখন আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের স্ত্রী-সন্তান এবং স্বজনরা লুটে নিয়েছেন।
দুদকের সমন্বিত কুষ্টিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিজন কুমার রায় বলেন, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের বহুতল বাণিজ্যিক ভবনে দোকান বরাদ্দে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আজকে আমরা জেলা পরিষদে অভিযান পরিচালনা করেছি। জেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে নথিপত্র সংগ্রহ করেছি। আরও বেশকিছু নথিপত্রের ফটোকপি দেয়ার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগ রয়েছে, জেলা পরিষদের দোকান বরাদ্দের জন্য কোনো রকম বিজ্ঞপ্তি জারি না করে, নিজেদের মন মতো অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে আ.লীগ নেতা ও তাদের পছন্দের লোকদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ভবনটির প্রতি ফ্লোরে জায়গা রয়েছে ১৮ হাজার বর্গফুট। গত বছর কোটা বিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ক্ষোভের মুখে পড়ে বাণিজ্যিক ওই ভবনটি। আন্দোলনের শেষদিকে ৪ আগস্ট ভবনের সামনের অংশে ব্যাপক ভাঙচুর চালায় ছাত্র-জনতা। পরে ভবনটি সংস্কার করে অতি গোপনে পলাতক আ.লীগ নেতাদের নামে বরাদ্দ চূড়ান্ত করে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদ। আ.লীগ আমলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ধরনা দিয়েও একটি দোকানও পায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, দোকান বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের কোনো আবেদনপত্র জমা নেওয়া হয়নি। ইচ্ছামতো হরিলুট করা হয়েছে দোকানঘর। কেউ টুঁ শব্দ করার সাহস পায়নি। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত অভিজাত এই মার্কেটে দোকান পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় একশ বর্গফুটের একটি দোকান ৫ কিস্তিতে ১৮ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। অথচ এসব দোকানের বাজারমূল্য ৫০ থেকে ৮০ লাখ টাকা। আবার নেতা ও তাদের আত্মীয়স্বজনের সুবিধার জন্য ৫ কিস্তিতে জমা নেওয়া হয় টাকা। সেই হিসাবে মাত্র সাড়ে তিন লাখ টাকা জমা দিয়ে দোকান পেয়ে যান তারা। বাকি টাকা তিন বছর ধরে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। কয়েকদিনের মধ্যে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতিনিধি ও তাদের আত্মীয়দের কাছে চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র দেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেন ওই কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকের কিস্তির টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। তারপর এক বছর অতিবাহিত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ। উল্টো আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক নেতার কাছ থেকে গোপনে কিস্তির টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সরকার পরিবর্তনের পর জেলার ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন অনিয়ম উৎপাট হবে এবং তারা দোকান বরাদ্দ পাবেন। কিন্তু তা হয়নি। পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে এসব দোকানের চূড়ান্ত বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্তু নিয়েছে জেলা পরিষদ। ইতোমধ্যে সেই প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে। চূড়ান্ত করা হয়েছে তালিকা, জমা নেওয়া হয়েছে তিনশত টাকার স্ট্যাম্প। এসব কাজ চলছে অতি গোপনে।
নথিপত্র থেকে জানা গেছে, দোকান হরিলুটের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও তৎকালীন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী রবিউল ইসলাম। তিনি একাই নিয়েছেন দশটি দোকান। তার তিন মেয়ে জাকিয়া মাসুদ, রুমানা সুলতানা, রেবেকা সুলতানা, ছেলে রকিবুল ইসলাম ও বিয়াই রঞ্জু আহমেদের নামে নিচতলায় দোকান নিয়েছেন। এছাড়া আরও ৫ জন নিকটাত্মীয়ের নামে রয়েছে পাঁচটি দোকান।
তালিকার পরের স্থানেই রয়েছেন আওয়ামী লীগের উপকমিটির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ও গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা সদর আসনের এমপি প্রার্থী দিলীপ কুমার আগরওয়ালা। তিনি নিজের নামে চতুর্থ তলায় একাই নিয়েছেন ছয়টি দোকান।
শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি তাইজাল আলী খান নিয়েছেন চারটি দোকান। তার ছেলে ১০নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খান ওয়াহিদ রনির নামে দুইটি ও আত্মীয় তৌহিদ একটি এবং আরেক আত্মীয়ের নামে নেওয়া হয় আরও একটি দোকান। কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান আত্মীয়স্বজনের নামে নিয়েছেন চারটি দোকান।
এছাড়াও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা, কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য ও মিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কামারুল আরেফিন, জেলা যুবলীগের সভাপতি রবিউল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল ইসলাম স্বপন, ভেড়ামারা পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক তরিকুল ইসলাম মানিক, শহর যুবলীগের সদস্য কিশোর কুমার ঘোষ, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য হাবিবুল হক পুলক, কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সদস্য গৌরব চাকী ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মানব চাকী, দৌলতপুর আওয়ামী লীগের সদস্য আসাদুজ্জামান চৌধুরী লোটন, জেলা জাসদের সাধারণ সম্পাদক আহম্মদ আলী, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ফজলে করিম খোকা এবং পৌর ১০নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি আব্দুস সালাম নিয়েছেন একটি দোকান।
নেতাদের পরিবারের মহিলা সদস্যদের নামেও রয়েছে অর্ধশত দোকান। হানিফ নিজেও ওই ভবনের সপ্তম ও অষ্টমতলা তৎকালীন লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান হিসাবে স্ত্রী ফৌজিয়া আলমের নামে ভাড়া নিয়েছেন। হরিলুটে যুক্ত ছিলেন জেলা পরিষদের কর্মকর্তারাও।
জেলা পরিষদের সদ্য বিদায়ি সহকারী প্রকৌশলী রুহুল আজম স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়স্বজনের নামে নিয়েছেন ৫টি দোকান, সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহিনুর রহমান নিয়েছেন দুইটি দোকান, সাবেক এক প্রধান নির্বাহী নিয়েছেন একটি দোকান।
জেলা পরিষদ টাওয়ার শপিংমল দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ইয়াসিন আলী বলেন, আওয়ামী লীগ নেতারা ছাড়াও তাদের স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের নামেও দোকান দেওয়া হয়। বিশেষ করে মহিলাদের নামের দোকানগুলি অধিকাংশই আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয়।
কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র বলেন, দোকান বরাদ্দের বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া। সব দোকান বরাদ্দপত্র চূড়ান্ত করা হয়েছে। ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে মালিকদের কাছে চূড়ান্তপত্র দেওয়া হবে।
যারা সমুদয় টাকা পরিশোধ করেছেন, তাদের দোকানের চূড়ান্ত বরাদ্দ দিতে হবে। এখানে আমাদের কিছুই করার নেই। পলাতক নেতাদের নামে কীভাবে বরাদ্দ দেবেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো অভিযোগ পড়লে সেটি আমরা দেখব।
দুদকের অভিযান চলাকালে মুকুল আরও বলেন, দুদকের একটি টিম অভিযান চালিয়েছে। আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করেছি। তারা নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন। দোকান বরাদ্দে অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি আমার জানা নেই। যে বা যারা অনিয়ম দুর্নীতির সাথে জড়িত বলে প্রমানিত হবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সুত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি হাজি রবিউল ইসলাম। তার সময়ে জেলা পরিষদে শুরু হয় হরিলুটের মহোৎসব। ৫ বছরে উন্নয়ন প্রকল্প থেকে হাতিয়ে নেন শত শত কোটি টাকা। জেলা পরিষদের জায়গা নিয়েও তার বিরুদ্ধে রয়েছে ভয়ংকর সব অভিযোগ। তার কপাল খুলে দেয় জেলা পরিষদের নির্মিত বহুতল বাণিজ্যিক ভবন।
২০২২ সালে ক্ষমতা ছাড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত চলেছে দোকান ও স্পেস বরাদ্দের নামে হরিলুট। ৫ম তলা পর্যন্ত ২৫২টি দোকানের মধ্যে শতাধিক দোকান ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মী ও তাদের স্ত্রী-সন্তানসহ আত্মীয়স্বজনের নামে বরাদ্দ দেন। প্রতি বর্গফুট ১৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও জায়গায় ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন হাজি রবিউল ইসলাম। কয়েক বছরে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। তিনি ছিলেন মাহাবুবউল আলম হানিফের সবচেয়ে আস্থাভাজন।
আরও পড়ুন – দেশে ১/১১ এর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে – উপদেষ্টা মাহফুজ
কুষ্টিয়া শহরের জনবহুল ১২৮নং নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়কের নিজস্ব জায়গায় ২০১৮ সালে নয়তলাবিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদ। প্রায় ৪১ কাঠা জমির ওপর নির্মিত ভবনের প্রতি ফ্লোরে জায়গা হয়েছে ১৮ হাজার বর্গফুট। সুসজ্জিত বাণিজ্যিক ভবনটির নাম দেওয়া হয় ‘কুষ্টিয়া জেলা পরিষদ টাওয়ার’। ভবনের প্রথম তলা থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত রয়েছে শপিংমল। পঞ্চম তলায় জেলা পরিষদের নিজস্ব কার্যালয়। ষষ্ঠতলা বরাদ্দ নিয়েছে বিআরবি গ্রæপ। সপ্তম ও অষ্টমতলা ভাড়া নিয়েছেন লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চেয়ারম্যান হানিফের স্ত্রী ফৌজিয়া আলম।






