স্টাফ রিপোর্টার
সুমাইয়া এবার দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠলো। প্রতিদিন প্রকিূলতার সাথে যুদ্ধ করে খেয়া নৌকায় গড়াই নদী পার হয়ে ওরা তিন ভাই বোন একসাথে স্কুলে যায়। ওর এক প্রতিবেশী সাথী ছিলো। সে এবার ওদের স্কুল থেকে টিসি নিয়ে নদীর এপাড়ে ভর্তি হয়েছে। সুমাইয়ার বড় ভাই দশম শ্রেণির ছাত্র। সে অনেকটা শ্রবণ প্রতিবন্ধী। বড় রাস্তা (আঞ্চলিক মহাসড়ক) পাড় হওয়া সমস্যা। তাই তিন ভাই বোন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পাড় হয়ে স্কুলে যায়।
কুষ্টিয়ার খোকসার খানপুর-মোড়াগাছা ভূমিহীন পল্লীর ফরিদা খাতুন ও কবিরুল দম্পতির তিন সন্তান সিয়াম দশম শ্রেণির ছাত্র, সায়েম ৬ষ্ঠ শ্রেণি আর সুমইয়া এবার উঠলো দ্বিতীয় শ্রেণিতে। সবার ছোট সুমাইয়া গত দুই বছর আগে গড়াই নদী পাড় হয়ে হিজলাবট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলো। মা আর বড় দুই ভাই তাকে কোলে পিঠে করে খেয়া নৌকায় নদী পাড় করে স্কুলে নিয়ে যাওয়া শুরু করে। এবার সে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠলো। এখন একটু বড় হয়েছে। এখন সে সাঁতার জানে। তবে গরমের সময় নদীর চরের বালির মধ্যে দিয়ে হাটতে একটু কষ্ট হয়। গলা শুকিয়ে যায়। এবার তার একমাত্র সাথী অরনি নদীর এপারের (উপজেলা সদরের) স্কুলে ভর্তি হওয়ায় তার বয়সী আর কেউ রইল না। বড় ভাই সিয়ামের কারণেই তাকে নদী পাড় হয়ে বালুচর মারিয়ে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে স্কুলে যেতে হবে। গত দুই তিন বছর আগেও মোড়াগাছা, হিলালপুর, খানপুর ও হিজলাবট দ্বীপচর থেকে প্রায় ত্রিশজন শিশু শিক্ষার্থী গড়াই নদী পাড় হয়ে হিজলাবট সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দেবীনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস করতো। কিন্তু সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রনে ধুয়োতুলে ঘাটটি বন্ধ করে দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা উপজেলা সদরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। কিছু দিন পর ঘাট টি আবার চালু হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের বছরের প্রথম দিন নতুন বই নিয়ে খেয়া নৌকায় নদী পাড় হয়ে বাড়ি ফিরছিল সুমাইয়া, সাইম ও তাদের মা ফরিদা। খেয়া ঘাটে দাড়িয়ে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানালেন তিনি। প্রায় ১৫ বছর আগে কৃষিশ্রমিক দম্পতি নদীর উত্তর পাড়ের খানপুর ভূমিহীন পল্লীতে আশ্রয় পান। কিন্তু বড় ছেলে সিয়াম কানে কম শোনা আর বড়রাস্তা পার হতে ভয় পাওয়ায় তাকে নদীর দক্ষিন পাড়ের হিজলাবটে ভর্তি করেন। তখন প্রতিদিন একমাত্র ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। এভাবে পর্যায় ক্রমে তিন সন্তানকে তিনি নদীর পাড় হয়ে হিজলাবটে ভর্তি করেন। আসা যাওয়া করেন ফরিদা। ঘাটের মাঝি আয়ুব আলী তার সন্তানদের কাছ থেকে টাকা পয়সা নেন না। আবার নদী পাড়ের স্কুলেও একটু সুবিধা আছে।
তিনি আরও জানান, কৃষি শ্রমিক স্বামী কবিরুল সকালে কাজে বেড়িয়ে গেলে সেও সন্তানদের নিয়ে স্কুলের উদ্যেশে বের হন। দুইজনে ফেরেন আবার বিকালে। তিনি সন্তান লালন করছেন।

এখানেই কথা হয় শিশু সুমাইয়ার সাথে। নদী পাড় হওয়া তার জন্য খুব সমস্যা না। দশম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া দুই ভাই ছাড়া তার আর কোন সাথী নাই। এ ছাড়া গরমের সময় নদীর চর পাড়ি দেওয়া কষ্ট হয়। তৃষ্টায় গলা শুকিয়ে যায়। এখন সে সাঁতার জানে নদী পাড় হতে ভয় লাগে না। তয় (তবে) পানি যেখুন (যখন) বেশী হয় তখন একটু ভয় হয়। তখন বড় ভাই সাথে থাকালে সাহস হয়। তার বড় ভাই সিয়াম কানে শোনে না। তা ছাড়া বড় রাস্তা পাড় হতে ভয় পান। তাই তাকে নদী পাড় হয়ে স্কুলে যেতে হয়। বড় ভাই কানে শুলে তারা ওপাড়ের স্কুলে যেতোনা।
খেয়া ঘাটের মাঝি আয়ুব আলী জানান, একজন দিন মুজুরের তিনটে বাচ্চা পড়া লেখা করাচ্ছে তাই তিনি তাদের কাছ থেকে ঘাট খাজনা নেন না। আগে যখন ২৫/৩০ ছাত্র প্রতিদিন পাড় হতো তাদের কাছ থেকেও পাড়াপাড়ের জন্য খাজনা নিতেন না।






