কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডা.শফিকুর রহমান বলেছেন, ৫৪ বছর ধরে যখন যে ক্ষমতায় এসেছে এ দেশকে খাবলে খামচে একেবারে তছনছ করে দিয়েছে। আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চরিত্র পরিবর্তন না হলে দেশের জন্য ভালো কিছুই করতে পারবে না।
সোমবার সকাল ৯টায় কুষ্টিয়া আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে শুরু হয় জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী জনসভা। ভোর থেকে দলটির নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে। স্বেচ্ছাসেবকরা শহরের বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নিয়ে জনসভাস্থলের পথ সুগম রাখার চেষ্টা চালান। সকাল ১০টার মধ্যে জামায়াত আমিরের জনসভাস্থলে পৌঁছানোর কথা থাকলেও কুয়াশায় বিলম্বিত হয় তার যাত্রা। জনসভাস্থলে পৌঁছান প্রায় ১২টার দিকে।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় জামায়াত আমির বলেন, সাড়ে ১৫ বছর পর যখন একটা পরিবর্তন আসলো, আমরা দেখলাম পুলিশ নাই, বিজিবি নাই, আনসারের ছায়াও নাই। নিভু নিভু অবস্থায় আমাদের সেনাবাহিনী জান দিয়ে চেষ্টা করছে কিছু করার, তারা পারছে না। তাদের পাশে মজবুত হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। এ দেশ আমাদের দেশ। এত মজলুম একটা সংগঠন নেতৃবৃন্দকে খুন করা হলো, ফাঁসি দেওয়া হলো। দফায় দফায় জেলে পোড়া হলো, অফিস বন্ধ করে রাখা হলো। ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হলো। আমাদের নিবন্ধন কেড়ে নেওয়া হলো। শেষপর্যন্ত বেদিশা সরকার বেহুশ হয়ে আমাদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। এরপরে আর হুশ ফিরে পায়নি। ওই বেহুশ অবস্থায় দেশ ছেড়ে তারা চলে গেছে।
জনসভায় ১১দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির ও কুষ্টিয়া-২ আসনের দলীয় প্রার্থী আব্দুল গফুর, সেক্রেটারি সুজা উদ্দিন জোয়ার্দ্দার, কুষ্টিয়া-৩ আসনের প্রার্থী আমির হামজা, কুষ্টিয়া-১ আসনের প্রার্থী বেলাল উদ্দিন, কুষ্টিয়া-৪ আসনের প্রার্থী আফজাল হোসাইন ও কুষ্টিয়া শহর জামায়াতে ইসলামীর আমির এনামুল হক।
কুষ্টিয়ার সমস্যার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আমির শফিকুর রহমান বলেন, এখানে আপনাদের অনেকগুলো সমস্যা আছে। আমরা যখন আসছিলাম উপর থেকে দেখছিলাম, পদ্মা গড়াই নদী নয়, যেন মরুভূমি। এটা যখন মরুভূমি হয়ে গিয়েছে তখন উপর থেকে যখন ঢলের পানি আসে তখন আর নদীতে থাকে না। দুই কুল উপছে উপছে পড়ে, দুই কুল ভাসিয়ে সবকিছুকে তছনছ করে দেয়। বছরের পর বছর নদী ভাঙনের কবলে পড়ে বহু মানুষের জীবনের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। অনেক মানুষ সর্বশান্ত। কেন এমনটা হলো? নদী তো আল্লাহর নিয়ামত।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে আল্লাহর এই নিয়ামতগুলোকে তিলে তিলে খুন করা হয়েছে হত্যা করা হয়েছে। এই নদী খননের জন্য প্রত্যেক বৎসর বাজেট থাকে। নদী খননের সমস্ত টাকা মুখ দিয়ে ঢুকে, পেটের ভিতরে চলে যায়; নদীর বালি আর ওঠে না। খননও হয় না। উন্নয়নের নামে ৫৪ বছর কমবেশি যারাই ক্ষমতায় গিয়েছেন এই একই কাজ তারা করেছে।
৫ আগস্টের পর শতশত মানুষকে অন্যায় মামলার আসামি করা হয়েছে অভিযোগ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, সেই আসামিতে জনগণ আছে, আইনশ্খৃলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আছেন। এমনকি সিভিল সার্ভিস প্রশাসনের লোকেরাও আছেন। এইতো শুরু হয়ে গেল মামলা বাণিজ্য। জায়গায় জায়গায় আমাদের ভাইয়েরা নেমে পড়লেন চাঁদাবাজি করতে। এই ভাইদের প্রতি আমরা খুব দরদ ভরা মনে বলতে চাই, সত্যিই যদি আপনাদের সংসারে অভাব অনটনের কারণে আপনারা এই কাজগুলা করে থাকেন। আসুন, আপনারা এখান থেকে সরে আসুন। আল্লাহ আমাদেরকে যে রিজিক দিয়েছেন, ওইটাই আপনাদের সাথে ভাগাভাগ করে ফেলতে রাজি আছি।
তিনি আরও বলেন, দেশের অন্যতম বৃহৎ চালের মোকাম কুষ্টিয়ায়। এখানে খাজনার নামে চাঁদা তোলা হয় অভিযোগ তুলে আমির বলেন, এখান থেকে চাল বোঝাই করে ট্রাক রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। এখানে প্রতিটি ট্রাক থেকে বেসরকারি খাজনা আদায় করা হয়। চাঁদা বললে মানুষ একটু লজ্জা পায়, এইজন্য বললাম বেসরকারি খাজনা। রেটও ভালো। প্রতি ট্রাকে ৫০০০ টাকা। ট্রাকের মালিকরা অতিষ্ট, ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ।
তিনি বলেন, আমরা নিজেরা খাওয়ার জন্য রাজনীতি করি না এবং দলীয় কর্মীদের পেট ভরানোর জন্য আমরা রাজনীতি করি না। বরঞ্চ এদেশের দুঃখী ভোখা নাঙ্গা মানুষের মুখে একটু খাবার তুলে দিতে পারি। আর পিঠে একটু কাপড় তুলে দিতে পারি সেই রাজনীতি করি। এটাই হবে আমাদের সংগ্রাম, ইনশাআল্লাহ।
‘নদী বাঁচলে মাটি বাঁচবে। মাটি বাঁচলে আমার মা বাঁচবে।’ মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, আমরা দুইদিন আগে উত্তরবঙ্গ সফর করে এসেছি। একইভাবে ওখানেও নদী খুন করা হয়েছে। ওখানে চারটা প্রধান নদী আছে, সেই নদীকে নদীগুলোকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা বলেছি, ওখানে আমাদের জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম শুরু হবে। আমরা এখানেও কথা দিচ্ছি, ইনশাআল্লাহ নদী বাঁচানোর মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের সংগ্রাম আমরা শুরু করবো ইনশাআল্লাহ।
কুষ্টিয়ার চিনিকল বন্ধ হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, কুষ্টিয়া চিনিকল বন্ধ হয়ে আছে। দুনিয়ার সব জায়গায় ইন্ডাস্ট্রির বিস্তার ঘটছে, আর আমাদের একটা একটা করে তালা ঝুলানো হয়েছে। শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামে আমির যখন শিল্পমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন আজ থেকে আর কোনো সরকারি কল কারখানায় তালা ঝুলবে না। বরঞ্চ ঝুলা তালা যেখানে যেখানে আছে সেগুলা খোলার চেষ্টা করবো আমি এবং তিনি তাই করেছিলেন। বন্ধ লোকসানি চিনিকলগুলা খুলে দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সেইগুলাকে মাত্র আড়াই বছরের মাথায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন।
‘তিনি করতে পেরেছিলেন তার ব্যক্তিগত সততা ছিল। তার মাঝে স্বজন প্রীতি ছিল না। তিনি একজন বিশ্ব নেতা ছিলেন। তিনি জাতির জন্য প্রাণভরে কাজ করতে চেয়েছিলেন। তিনি বুয়েট থেকে পাশ করা কোনো ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না। তিনি একজন আলেমে দ্বীন ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন ছাত্র ছিলেন। তিনি যদি শিল্পে এসে শিল্পের বিপ্লব ঘটাতে পারেন। বিপ্লব ঘটাতে পারেন। আমরা বিশ্বাস করি জনগণ যদি সুযোগ দেয় ইনশাআল্লাহ তাআলা আজিম বাংলাদেশের সকল সেক্টরে বিপ্লব ঘটবে। প্রায় ৩০ মিনিট মতো বক্তব্য রাখেন জামায়াতের আমির ডাঃ শফিকুর রহমান।






