এবারও ভোট দিতে পারবে না কাজল রেখা দম্পতি

0
20

স্টাফ রিপোর্টার

মাত্র সাড়ে ৬শ টাকা জোগার করতে ব্যর্থ হওয়ায় ভোটার হতে পারেনি কাজল রেখা দম্পতি। এবারেও ভোট দিতে পারবে না। কিন্তু ভোট দেওয়ার অপরাধে ঘরবাড়ি ফেলে প্রায় ১৫ বছর গ্রাম ছাড়া পরিবারটি।

কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের জাগলবা গ্রামে রাস্তার পাশে মামার জমিতে খুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছেন কাজল রেখা ও বাবু শেখ দম্পতি। ঘর বাড়ির অবস্থা জসিমউদ্দিনের “আসমানি” গল্পকেও হারমানায়। স্বামী উপাজনে দুই বেলা দু মুঠো খাবার জোটে। ১৫/১৬ বছর আগে নিজের গ্রামে ধানের শীষের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলেন। তার পর আর ভোটার হতে পারেনি। এ বছরেও ভোট দিতে পারবে না। ইউনিয়ন পরিষদের ভোটর সময় অনেকেই ভোট চাইতে এসে তাদের গল্প শুনে অবাক হয়েছে। ভোটার করে নেওয়ার প্রতিশ্রæতিও দিয়েছে। ভোট চলে গেছে সে প্রতিশ্রæতিও ভুলে গেছে নেতার লোকজন।

এই দম্পতির আগে বাড়ি ছিলো ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপার ছোট মৌকুড়ি গ্রামে। সেখানে নিজের ১৪ শতক জমির উপর বাড়ি ছিলো। হাঁস মুরগি ঘরসহ সব ছিলো। ১৫/১৬ বছর আগে এক এমপি নির্বাচনে তাদের বিপক্ষের নৌকা মার্কার লোক জিতে যায়। এর পর হামলার আর অত্যাচারে নদী পাড় হয়ে খোকসার মধ্যে চলে আসেন। তার পরে আর গ্রামে ফিরতে পারেন নি। স্থানীয় কৃষকদের জমিতে শ্রমিকের কাজ করেন। একমাত্র মেয়ে বন্যাকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে বিপ্লব মহাজনের কাছ গাছ কাটার কাজ নিয়েছে।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ, শেষ রাজার ভোটের আগে তারা স্বামী স্ত্রী মিলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা হেলাল উদ্দিনের কাছে ভোটার হওয়ার জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই নেতা কয়েকদিন ঘুড়িয়ে তার পর জানায়, তাদের বাড়ির ট্যাস্কের জন্য ৬৫০ টাকা ইউনিয়ন পরিষদে জমা দিতে হবে। কিন্তু জোন-পাট দিয়ে খাওয়া, পেটের ভাত হয় না। তার আবার ভোটার হওয়া। তারা আর ভোটার হওয়ার চেষ্টা করেনি।

শুক্রবার সকালে খোকসা-চাঁদট পাকা রাস্তার পাশের বিবর্ণ টিনের খুপড়ি ঘরটি চোখে পরে। স্বামী সন্তানসহ কাজল রেখা এই টিনের তৈরী খুপড়ি ঘরে বাস করেন। এ ঘরের কোন বেড়া নেই। নেই দরজা-জানালা। ঘরের বেশির ভাগ বেড়ার পরিবর্তে পাট কাটি দিয়ে ঢেকে রাখা। তাও উইপোকায় খেয়ে গেছে। শীত বৃষ্টি উপেক্ষা করে এর মধ্যে বাস করে পরিবারটি। কিছু অংশের বেড়া তৈরী করা হয়েছে নদীর ভাঙ্গন রোধে দেওয়া বিশেষ ধরনের কাপড় দিয়ে। রান্নার জায়গার পুরোটাই পলিথিন দেওয়া। কাজল রেখা ঘরে ছিলেন না। লোক দেখে এগিয়ে এলেন। জানালেন স্বামী গেছে কৃষকের পেঁয়াজ কোপানোর কাজে। আর ছেলে গেছে মহাজনের গাছ কাটা কাজ করতে।

কাজল রেখা অনেকটা বুদ্ধি প্রতিবন্ধি। গল্প বলতে গিয়ে সে জানান, তারা এই গ্রামের বাসিন্দার না। সেবার ধানের শীষে ভোট দেয়। কিন্তু তার বিপক্ষ নৌকা জিতে যায়। এর পর থেকে গ্রামে শুরু হয় “মারামারি-কাটাকাটি”। একদিকে বাপের বাড়ি অন্যদিকে শশুবাড়ির জমি বাড়ি ফেলে তারা রাতের আধারে নৌকায় এসে নানা বাড়িতে আশ্রয় নেয়। অনেক দিন হয়ে যাওয়ার পর মামা এই জমি দিয়েছে ঘর করে থাকার জন্য। স্বামীর আয়ে তাদের শুধু খাওয়াই জোঠে।

গল্পে গল্পে কাজল রেখা আরও জানায়, চেয়ারম্যান মেম্বরের ভোট আসলে তখন লোকজন এসে বলে তাদের ভোটার করে নেবে। কিন্তু ভোটার হওয়া আর হয় না। ভোটার হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের নেতা হেলালের কাছে গিয়েছিলো কিন্তু সেও ভোটার করতে পারেনি। উল্টো ৬৫০ টা টাকা লাগবে জানিয়ে ছিলো। টাকাও জোগার করতে পারেনি আর ভোটাও হতে যেতে পারেনি। একবার ভোট দিয়ে গ্রাম ছাড়া হয়েছেন। আবার ভোট দিয়ে যদি মামা বাড়ির গ্রামও ছাড়তে হয় এই ভয়ে আছেন।

আওয়ামী লীগের নেতা হেলার উদ্দিন বলেন, কাজল রেখা তাদের নিজের লোক। রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজের বাড়ি ঘর ফেলে এখানে চলে এসেছে। ভোটার ট্রানেস্ফার করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পারেননি।

বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বর আব্দুল মতিন জানান, রাজনৈতিক সহিংসতার কারনে ১৫/১৬ বছর আগে কাজল রেখা স্বামী সন্তান নিয়ে এই গ্রামে আশ্রয় নেয়। অন্যের জমিতে ঘর করে মানবেতর জীবন পার করছে। ভোটার হতে বিদ্যুৎ বিলের কপি, ট্যাস্কের কাগজ, জমির কাগজ, মোবাইল ফোন লাগবে। ওদের বাড়িতে বিদ্যুৎ নাই, ট্যাস্ক নাই কিভাবে ভোটার হবে বা আগের ভোটার স্থানান্তর করবে। এসব কারনেই ভোটার হতে পারেনি।