বাউল শিল্পীদের সেবায় কাঠের বাদ্যযন্ত্র তৈরী করেন জবান আলী

0
19

স্টাফ রিপোর্টার

নির্জন পথের ধারে টোং দোকান ঘরের সামনে বেশ কিছু দোতরা ঝুলছে। সামনে একজন সৌখিন ক্রেতা একটি দোতারার তারে হাত রেখে টুং টুাং ধ্বনী তোলার চেষ্টা করছেন। ভিতরে আরও দোতার তৈরীর কাজ করছিলেন ষাটউদ্ধ বয়সী জবান আলী। কথা বলতে শুরু করার আগেই খানিকটা ঝেড়ে কেশে গলা পরিস্কার করে নিলেন। জানালেন ৪০ বছর ধরে কাঠের বাদ্যযন্ত্র দোতারা ও সারিন্দা বানাচ্ছেন। কিন্তু পূজির আভাবে ব্যবসায় বড় করতে পারেন নি।

কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়কের কুষ্টিয়া অংশের শেষ প্রান্তে খোকসার শিমুলিয়া কুঠি পাড়া। সড়কের পাশে জবান আলীর দোতার বিক্রির টোং দোকান। পেছনে তার বসত বাড়ি। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর লালন ভক্ত রাশিদাকে বিয়ে করেন। ৮ বছর বয়সী এক ছেলে রেখে সেও গত তিন বছর আগে সৌদি আরবে পারিজমিয়েছে। দোতারা বানিয়ে তার (জবান আলী) জীবন কাটছে। রক্ত পায়ো কাঠের খোলের উপর ভেড়ার কাঁচা চামড়ার ছাউনি দিয়ে তৈরী করা দোতারা ও সারিন্দা চাহিদার সাথে বিক্রি হয়। তিনি প্রতিমাসে ৫/৬ টি বাদ্যযন্ত্র বিক্রি করেন। এবার প্রবাস থেকে স্ত্রী রাশিদা কিছু টাকা পাঠিয়েছে। সেই টাকা দিয়ে ৩৫/৪০টি দোতারা এবং কয়েটি সারিন্দা বানানোর লাল পায়ো কাঠ কিনেছেন। একটি কাঠ কাটার মেশিনী বানিয়েছেন। অবশিষ্ট টাকা দিয়ে কুষ্টিয়া-রাজাবাড়ী সড়কের পাশে টোং দোকান তৈরী করে সেখানেই তার বানানো বাদ্যযন্ত্রের শো’ দিয়েছেন।

প্রায় ৪০ বছর আগে যুবক বয়সে জবান আলী শখের বসে স্থানীয় কাঠ মিস্ত্রী মুজাহার শেখের কাছে দোতারা বাজানো শেখার তালিম নিতে শুরু করেন। তার ওস্তাদ নিজেও দোতারা তৈরীর কারিগর ছিলেন। সেখানে ছয় বছর তালিম নিয়েছেন। বাজনা শেখা সাথে সাথে দোতারা তৈরীর করিগর হয়ে গেছেন। লালনের আখড়া বাড়ির দোকানে দোকানে দোতারা পাইকারি বিক্রি শুরু করেছিলেন। কিন্তু পুজি ও সহযোগী (হেলপার) সংকটে পাইকারি বিক্রি বন্ধ করে রেখেছেন। তবে বাড়িতে বসে নিজে তৈরী দোতারর খুচরা বিক্রি করেন। নিজের তৈরী দোতরা ৩ হাজার টাকা থেকে ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করে থাকেন জবান আলী।

দোতারা বাদক হতে গিয়ে দোতারার কারিগর হয়ে যাওয়া জবান আলী বলেন, একজন মিস্ত্রি দিয়ে একটা ভালোমানের দোতারা তৈরী করেতে ৬/৭ দিন সময় লাগে। সারিন্দা বানাতে আরও একটু বেশী সময় ব্যয় হয়। এ ছাড়া বহনযোগ্য ভালো মানের সিজন করা কাঠ ও ভেড়ার কাঁচা চামড়ার ছাউনির উপর যন্ত্রের মান নির্ভর করে। ভালো মানের যন্ত্র তৈরীর জন্য সময় ও পরিশ্রম বেশি ব্যয় হয়। পরিশ্রয় অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না।

জবান আলী আরও বলেন, দোতারা ও সারিন্দা বাউল গানের প্রধান বাদ্যযন্ত্র। প্রতিটি শিল্পীর কাছে এ যন্ত্রের বিকল্প নেই। বাউল শিল্পীরা যতদিন বেচে আছেন ততদিন এই যন্ত্রের চাহিদা থাকবে। বাংলার লোক সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান বাদ্যযন্ত্র তৈরীর মধ্যদিয়ে তিনি শিল্পীদের সেবা করে যাচ্ছেন। সরকারী বেসরকারী সহয়তা পেলে এই শিল্প রক্ষার কাজ এগিয়ে নিতে পারতেন। এ ছাড়া এ ব্যবসাকে গতিশীল করতে আরও জনবল নিয়োগ করবেন।

দোতারার সৌখিন ক্রেতা প্রভাষক মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে বাস করে গোটা বাউল সমাজের সহায়তার কথা মাথায় রাখায় জবান আলীকে সাধুবাদ। লোক শিল্পকে রক্ষায় সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান কে এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।