দ্রোহ অনলাইন ডেস্ক
অমর একুশে ফেব্রæয়ারি, মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পূর্ণ হবে এদিন। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আজ দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে। একুশের ভোরে কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা জানাবে সর্বস্তরের জনতা।
দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীজুড়ে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে এ দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। বাঙালি জাতির কাছে এটি একদিকে যেমন গভীর শোক ও বেদনার, অন্যদিকে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল এক ঐতিহাসিক দিন।
১৯৫২ সালের এই দিনে ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তৎকালীন পূর্ববাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজ শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ নাম না জানা আরও অনেকে শহীদ হন। তাদের সেই আত্মত্যাগই আজ বিশ্বজুড়ে ভাষাপ্রেম ও অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একুশে ফেব্রæয়ারি সাধারণ ছুটি। একুশে ফেব্রæয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-একুশে ফেব্রæয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা বিধিমালা অনুযায়ী অর্ধনমিত থাকবে।
জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সংগতি রেখে, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্ব-স্ব কর্মসূচি প্রণয়নপূর্বক পালন ও সব সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদসমূহ যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপন করবে।
এদিনন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। পরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, ঢাকায় বিদেশী দূতাবাসের প্রতিনিধি, একুশে উদযাপন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থার প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তারা সবাই শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
কর্মসূচির মধ্যে আরো রয়েছে- রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর নির্ধারিত ধারাক্রম অনুযায়ী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের লক্ষ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অতিরিক্ত ৩০ (ত্রিশ) মিনিট নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকবেন।
একুশে ফেব্রæয়ারিতে শহীদ মিনার চত্বর ও আজিমপুর কবরস্থান এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের পাশাপাশি অতিরিক্ত জনসমাবেশ বা ভিড় নিয়ন্ত্রণ করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি রোধ করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এছাড়া সব সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, বাংলাদেশ বেতার এবং কমিউনিটি রেডিওসমূহ কর্তৃক একুশের অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে।
দিবসটি উপলক্ষে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়ক দ্বীপসমূহ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে বাংলাসহ দেশের অন্যান্য সকল জাতিগোষ্ঠীর বর্ণমালা সম্বলিত ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হবে।
এছাড়া, ভাষা শহীদদের রুহের মাগফিরাতের জন্য দেশের সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।
দিবসটি উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বেসরকারি রেডিও ও টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা স¤প্রচার এবং সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে।
গণযোগাযোগ অধিদপ্তরের ঢাকা মহানগরীতে ট্রাকের মাধ্যমে রাজপথে ভ্রাম্যমাণ সংগীতানুষ্ঠান এবং নৌযানের সাহায্যে ঢাকা শহর সংলগ্ন নৌপথে সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজনসহ জেলা-উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র প্রদর্শন করবে।
অন্যদিকে, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহে শহীদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করা হবে।
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এ উপলক্ষে শিশুদের নিয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, ছড়া ও কবিতা পাঠ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। দিবসটি উপলক্ষে বাংলা একাডেমি একুশে বইমেলার আয়োজন করবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা এ বইমেলায় অংশগ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মেলা উপলক্ষে বিশেষ শিশু সংখ্যা প্রকাশের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও অধীনস্থ শাখা জাদুঘরসমূহ, শিল্পাচার্য জয়নুল লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং প্রতœতত্ত¡ অধিদপ্তরের সকল প্রতœস্থান ও জাদুঘরসমূহ শিশু-কিশোর, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য ঐদিন বিনা টিকেটে পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে।
এছাড়াও, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও স্বাধীনতা জাদুঘরে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, ভাষা আন্দোলনের ওপর বিভিন্ন প্রামাণ্য নিদর্শন প্রদর্শন, ২০২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি অঙ্কন ও প্রদর্শন, শিশু-কিশোরদের সুন্দর বাংলা হাতের লেখা প্রতিযোগিতা এবং সেমিনারের আয়োজন করবে।
গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি গণগ্রন্থাগারসমূহে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং ভাষা আন্দোলন বিষয়ক আলোচনা সভার আয়োজন করবে।
এদিকে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুস্তরীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। শুক্রবার সকাল ১১টায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, পবিত্র রমজান মাস ও ফেব্রæয়ারির আবেগঘন প্রেক্ষাপটে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হবে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিবসটি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে প্রথমে শ্রদ্ধা জানাবেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। এছাড়া বিদেশি ক‚টনীতিকরাও শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। রাত আনুমানিক ১২টা ৪০ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ব্যাপক জনসমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে। এ উপলক্ষে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন থাকবে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি সোয়াট, ডগ স্কোয়াড, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও ক্রাইম সিন ইউনিট সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। গোয়েন্দা নজরদারি ও সাইবার মনিটরিংও জোরদার করা হয়েছে।
শহীদ মিনারে প্রবেশ ও প্রস্থানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রুট অনুসরণের আহŸান জানানো হয়েছে। সর্বসাধারণকে পলাশীর মোড় – জগন্নাথ হল ক্রসিং – শহীদ মিনার রুট ব্যবহার করে প্রবেশ করতে বলা হয়েছে। অন্য কোনো রাস্তা দিয়ে প্রবেশের অনুমতি থাকবে না। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রোমানা ক্রসিং হয়ে দোয়েল চত্বর অথবা চাঁনখারপুল হয়ে প্রস্থান করতে হবে।
নিরাপত্তার স্বার্থে ধারালো বস্তু, দাহ্য পদার্থ বা বিস্ফোরক দ্রব্য সঙ্গে না আনার অনুরোধ জানান ডিএমপি কমিশনার। তিনি বলেন, শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে অন্যদের সুযোগ দিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি।
এছাড়া সন্ধ্যার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রবেশপথে কিছু ট্রাফিক ডাইভারশন চালু থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে অমর একুশ উদযাপন সম্ভব হবে।’






