কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পবিত্র কোরআন শরীফ নিয়ে আপত্তিকর ও অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর (৫২) নামে কথিত এক পীরকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী। এসময় কথিত ওই পীরের আস্তানাও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
শনিবার দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর এলাকায় অবস্থিত দরবার শলীফে এই হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় শামীমের আরও দুই অনুসারী গুরুতর আহত হয়েছেন। নিহত শামীম ফিলিপনগর এলাকার সামসুল ইসলামের ছেলে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি নিজেকে ‘কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরী’র অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতেন।
হামলাকারীদের অভিযোগ, তিনি নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাতসহ ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোকে অস্বীকার করে ভিন্নধর্মী মতবাদ প্রচার করতেন। এমনকি অনুসারীদের হজ পালনের জন্য মক্কায় না গিয়ে স্থানীয় একটি বাঁশ বাগানের দরবারে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিতেন।
এছাড়াও, তার অনুসারীদের দাফনের সময় প্রচলিত ইসলামী নিয়ম উপেক্ষা করে ঢাকঢোল বাজানো, ‘হরে শামীম’ ধ্বনি দেওয়া এবং বিভিন্ন অস্বাভাবিক আচারের প্রচলনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। হামলাকারীদে অভিযোগ এই ভন্ড পীর নিজেকে কখনও আল্লাহ, কখনও নবী বা ভগবান দাবি করে থাকে। এসব কর্মকান্ডে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছিল।
সম্প্রতি শামীম তার দরবারে অনুসারীদের উদ্দেশ্যে পবিত্র কোরআন শরীফ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। শামীম দাবি করেন, “কোরআন যিনি লিখেছেন তিনিও মূর্খ এবং যারা এটি পড়েন তারাও মূর্খ।” এই বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এ ধারাবাহিকতায় শনিবার বেলা একটার দিকে শত শত বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ফিলিপনগর এলাকায় অবস্থিত শামীমের দরবার শরিফ ঘেরাও করেন। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা দরবারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও একাধিক কক্ষে অগ্নিসংযোগ করেন। এ সময় দরবারের ভেতরে থাকা শামীম ও তার দুই অনুসারী এলোপাথাড়ি পিটুনির শিকার হন।
বিকাল তিনটার দিকে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস গুরুতর আহত অবস্থায় শামীমসহ তিনজনকে উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা তিনটা ২০ মিনিটের দিকে তার মৃত্যু হয়। আহত বাকি দুজন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৫-৬ বছর ধরে শামীম ইসলামের নাম ব্যবহার করে নানা ধরনের বিতর্কিত কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। এর আগেও গান-বাজনা করে লাশ দাফন করাসহ বিভিন্ন কর্মকান্ড নিয়ে তিনি জনসমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। শামীমের বড় ভাই ফজলুর রহমান জানান, শামীম বেশ কয়েক বছর ধরে ওই দরবার পরিচালনা করে আসছিলেন।
শামীম ঢাকা থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে এলাকায় ফিরে এসে একটি আস্তানা গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে বিতর্কিত ধর্মীয় কার্যক্রম শুরু করেন।
প্রসঙ্গত এর আগেও ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। সে সময় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় একই ধরনের কর্মকান্ড শুরু করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ দরবার শরিফ এলাকা ঘিরে রাখেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দৌলতপুর থানা পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যেন নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।






