খোকসার নিহত দুই শিশু ও এক যবকের দাফন সম্পন্ন

0
7

স্টাফ রিপোর্টার

দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়া বাস থেকে উদ্ধার হওয়া নিহত দুই শিশু ও এক যুবককে খোকসার গ্রামের বাড়িতে দাফন ও সৎকার সম্পন্ন হয়েছে। তবে নিখোঁজ রয়েছেন অজ্ঞাত পরিচয়ের একবৃদ্ধ যাত্রী।

বৃহস্পতিবার কাকডাকা ভোরে কুষ্টিয়ার খোকসার সন্তোষপুর গ্রামের দোয়লোয়ার হোসেনের নিহত শিশু পুত্র ইসরাফিল (৩) এর মৃতদহ বাড়িতে আনা হয়। প্রায় একই সময়ে নিহত আয়শা সিদ্দিকা (১৩)র মৃতদেহ শোমসপুর গ্রামের বাড়িতে পৌচ্ছায়। সকাল সাড়ে ৬টার দিকে একই বাস দুর্ঘটনায় নিহত রাজিব বিশ্বাস (২৬) এর মৃতদেহ বহন করা এ্যাম্বুলেন্সটি তার গ্রামের বাড়ি খাগড়বাড়িয়াতে পৌচ্ছায়। একে একে মৃতদেহ গুলো পৌছানোর খবর ছড়িয়ে পরলে গ্রাম গুলোতে শোকাহত মানুষের ঢল নামে। তবে পরিবহনটির খোকসার কাউন্টার মাষ্টারের দেওয়া তথ্য মতে অপর এক বৃদ্ধ যাত্রীর সন্ধান মেলেনি।

সকাল ৯টায় উপজেলা শোমসপুরে পারিবারিক কবর স্থানে বড় চাচার কবরের পাশে দাফন করা হয় নিহত আয়শা সিদ্দিকা (১৩)কে। সে ১৮ পারা কোরআনের হাফেজা ছিলো। দুর্ঘটনার সময় শিশুটির মা লিটা খাতুন মেয়ে নিয়ে বাসে বসে ছিলেন। ছেলে আবুল কাশেম সাফিনকে নিয়ে বাবা গিয়াস উদ্দিন ফেরি ঘাটে নামেন। এর কয়েক মুহুত্যের মধ্যে ঘটে যায় মর্মস্পর্শী বাস দুর্ঘটনা।

নিহত শিশু আয়শা সিদ্দিকার বাবা গিয়াস উদ্দিন জানান, নিজের চোখের সামনে মেয়ে ও স্ত্রীকে ডুবে যেতে দেখেন। এক পর্যায়ে স্ত্রী ভেসে উঠলেও মেয়েকে আর উদ্ধার করতে পারেনি। পরে গভীর রাতে ডুবুরিরা মৃত আয়শাকে উদ্ধার করেন। রাতেই রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল থেকে আয়শার মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়। তারা শেষ রাতে মেয়ের মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। সকাল ৯ টায় পারিবারিক কবরস্থানে শিশুটির দাফন করা হয়। এই পরিবারটি কুমারখালী কাউন্টার থেকে সৌহাদ্য পরিবহনে বাসে উঠেন।

তিন বছরের শিশু ইসরাফিলের মৃতদেহ বৃহস্পতিবার প্রত্যুশে সন্তোষপুরে গ্রামে পৌচ্ছায়। এর পর থেকে শিশুটির স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে শোকের মাতম শুরু হয়। পরে তাকে সিংঘড়িয়া কবর স্থানে দাফন করা হয়। তারা পাংশা কাউন্টার থেকে বাসে ওঠেন।

নিহত রাজিবের মৃতদেহ উদ্ধার হয় বুধবার শেষ রাতে। এর পর তার মৃতদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সকাল সাড়ে ৬ টার দিকে রাজিবের মৃতদহ বহন করা এ্যাম্বুলেন্সটি খাগড়বাড়িয়া গ্রামে পৌচ্ছায়। এসময় গ্রাম শোকার্ত মানুষের ঢল নামে। নিহত যুবক যে কোম্পানিতে চাকুরি করতেন তার মালিকের আসার অপেক্ষায় মৃতদেহের সৎকার করতে বিলম্ব হয়। তবে দুপুর দিকে স্থানীয় শৈলডাঙ্গী মহাশ্মশানে যুবকের সৎকার করার জন্য নেওয়া হয়।

সকালে সরেজমিন এসব গ্রামে যাওয়া হয়। শোমসপুর গ্রামের আয়শা সিদ্দিকার দাফন করে স্বজনরা সবে বাড়ি ফিরছেন। বাড়ি জুড়ে সুনশান নিরবতা। জানাযার জন্য নিহত শিশু ইসরাফিলের মৃতদেহ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। শিশুর বাবা দেলোয়ারকে বাড়িতে প্রবেশের পথের পাশে গাছেন নিচে বসিয়ে শান্তনা দেবার চেষ্টা করছেন প্রতিবেশীরা। ফুপু শিউলি নিহত শিশুর খাটিয়ার পাশে বসে বিলাপ করছে। মা নূর নাহারকে ঘিরে শান্তনা দিচ্ছেন স্বজনরা। তিনি চোখের পলকও ফেলছেন না। তারা পাংশা কাউন্টার থেকে ওই বাসে যাত্রা করেন।

নিজের বাড়ির উঠানে রাজিবের নিথর দেহের পাশে বিলাপ করছিলেন মা রেখা রানী বিশ্বাস। নিহত যুবকের বাবা হিমাংশু বিশ্বাস কে প্রতিবেশীর ঘরের বারান্দায় বসিয়ে শান্তনা দেবার চেষ্টা করছেন স্বজনরা। কিন্তু সে দিকে পাত্তা না দিয়ে নিথর হয়ে বসে আছেন। খাটিয়া সাজানোর জন্য বাড়ির বাইরে শিশুরা রঙিন কাগজ কাটছে। গ্রামজুড়ে যেনো নিরবতার ¯্রােত বইছে। কেউ কথা বলছেনা। সবাই যেনো নির্বাক হয়ে পরেছে।

ঈশ্বরদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজিবের আত্মীয় সুজন মন্ডল জানান, রাজিবের মৃতদেহ উদ্ধারের পর তার কাছে হস্তান্তর করা হয়। একটি এ্যাম্বুলেস সার্ভিস থেকে তাদের লাশটি বড়িতে পৌচ্ছে দেওয়া হয়। এর জন্য তাদের টাকা দিতে হয়নি। দুপুর পর তিনিই মুঠো ফোনে নিশ্চিত করেন স্থানীয় মহাশ্মশানে রাজিবের সৎকার শুরু হয়েছে।

নিহত শিশু ইসরাফিলের বাবা দোলোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিটি গাড়ি ঝুঁকি নিয়ে ফেরিতে ওঠা নামা করে। তার মত আর কোন বাবা মা’র বুক যাতে খালি না হয় সেই জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে পল্টুন গুলোতে গ্রিল দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

আঠারো পারার কোরআনে হাফেজা মেয়ে আয়শাকে হারিয়ে অনেকটা চুপ হয়ে গেছেন গিয়াস উদ্দিন। তিনি শুধু বলেন, দুর্ঘটনার শুরুতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পাছিলেন না। মুহুত্যের মধ্যে তার মত অনেক বাবা মার বুক খালি হয়ে গেলে।

নিহতরা সবাই ঈদের ছুটি শেষ করে কুমারখালী থেকে ঢাকা গামী সৌহাদ্য পরিবহনের (রাজবাড়ী ব ১১-০০২৪ নম্বর) যাত্রীবাহী বাসে ঢাকায় ফিরছিলেন। খোকসার নিহত তিনজনে মধ্যে দুই শিশুর বাড়ি শোসপুর ইউনিয়নের শোমসপুর ও সন্তোষপুর গ্রামে। যুবক রাজিবের বাড়ি জানিপুর ইউনিয়নের খাগড়বাড়িয়া গ্রামে।